NRC ও CAB, অর্ধ-সত্যি নয়, সত্যিটা জানুন

কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত বিস্তারিত লেখার সিদ্ধান্তই নিলাম। আসলে বিগত কিছু দিন ধরে সংবাদ মাধ্যম, রাজনৈতিক দল ও সোশ্যাল মিডিয়া পন্ডিতদের অর্ধ -সত্য বলা এবং সেটাই মানুষের কাছে একমাত্র সত্য বলে তুলে ধরা দেখতে দেখতে বড্ড বিরক্ত লাগছে। বিশেষ করে বাংলার কোটি কোটি মানুষের কাছে এমন করে তুলে ধরা হচ্ছে যে, NRC এবং CAB একই। অসম, ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয় এবং বাংলার বিক্ষোভের কারণও এক। এবং বিজেপি যেন বাঙালির কফিনে পেরেক পুঁতে দিচ্ছে।

আসলে বরুণ সেনগুপ্তের মৃত্যু এবং অভীক সরকার আনন্দবাজার এর সম্পাদক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে, সাদাকে সাদা, কালো কে কালো বলা সাংবাদিকদের দিন শেষ। তাই আমার এই দুই শিক্ষা গুরুকে প্রণাম করে কিছু কটূ সত্য বলছি।

এক) CAB নিয়ে অপব্যাখ্যা ও অর্ধসত্য।

বিজেপি এবং অমিত শাহ এর রাজনীতির আমি বিরুদ্ধে। কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল(ক্যাব) পাশ করিয়ে অমিত শাহ বাংলাদেশ থেকে আসা 40 লাখ হিন্দু বাঙালি আর দুই লাখ চাকমা বৌদ্ধকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেলেন। এটাই সার সত্য।

শেখ মুজিবের মৃত্যুর পরেই বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র হয়ে যায়। বাংলাদেশের গ্রামে ও জেলা শহরে গরিব তফসিল হিন্দুদের উপর অত্যাচার শুরু হয়। এই হিন্দুরা বেশিভাগই ৪৭ এর দেশ ভাগ এবং ৭১ এ বাংলাদেশ রাষ্ট্র হওয়ার পরেও ওদেশেই ছিলেন। কারণ বর্ণ হিন্দুদের মত সব ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে আসার মত তাঁদের আর্থিক বা মানসিক অবস্থা ছিল না। অনেকেই আবার মুজিবের ধর্মনিরপেক্ষতার উপর বিশ্বাস করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধও করেছেন পাক খান সেনাদের বিরুদ্ধে। প্রাণ ও দিয়েছেন।

কিন্তু মুজিব এর মৃত্যুর পর অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এঁদের বিধর্মী বা মালাউন আখ্যা দিয়ে, বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে, মেয়েদের ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করে, ধর্ষণ করে বাংলাদেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়। আরবের টাকায় মৌলবাদী মুসলিমরা বাংলাদেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সঙ্গে জামাতরা। তাদের হাতে আক্রান্ত হয়ে সব হারিয়ে, জমি বাড়ি ছেড়ে বিএসএফকে টাকা দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে দলে দলে মানুষ ভারতে আসতে শুরু করেন আশির দশক থেকে।

কারও শোনা কথা নয়। আমি তখন বর্তমান পত্রিকায়। বরুণদার নির্দেশে সেই খবর করতে আমি দিনের পর দিন বসিরহাট, বনগাঁ, বাগদা, গাইঘাটা, চাঁদপাড়া, দুত্তফুলিয়া, হাঁসখালি ছুটে গেছি। এই উদ্বাস্তু বা অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে খবর বা কভার স্টোরি পুরান বর্তমান বা সাপ্তাহিক বর্তমান খুঁজলে পাওয়া যাবে।

বিশ্বাস করুন, মানুষ গুলো শুধুই কাঁদতো। আমার তখন বয়স কম। এমন দামড়া আধ বুড়ো পুরুষ মানুষদের কাঁদতে দেখে অবাক হয়ে যেতাম। সব ছেড়ে মাথায় দুটো পুটলি নিয়ে সীমান্ত পেরিয়েছে। ঘর নেই। থাকার জায়গা নেই। নদীর পাড় বা জলা জমিতে, রেল লাইনের ধারে, মাটিতে কাপড় পেতে থাকত।খালি আকাশ বা মাথায় হোগলার চাল। তখনও প্লাস্টিক ত্রিপল প্রচলন হয়নি। সেখানেই সংসার। তার মধ্যে বাচ্চা জন্মাচ্ছে। বিএসএফ, পুলিশ তো বটেই পার্টির দাদারও নিয়মিত টাকা নিত। সেইসঙ্গে উপরি হিসাবে ডাগর মেয়েদের সঙ্গে শুতো। অবর্ণনীয় অবস্থা।

বদলে এরা ভারতে থাকার আশ্বাস পেত। জন মজুর খাটত বা ভ্যান চলাত বা পঞ্চায়েত এর কাজও পেত। অনেকে বাড়ির ঝির কাজ করত। আবার অনেক মেয়ে বউ বিকেল বা দুপুরের ট্রেন ধরে শিয়ালদা স্টেশন নামত। তারপর হাড়কাটা গলি বা সোনাগাছিতে পতিতাবৃত্তি করে রাতের ট্রেনে আবার বাড়ি(?) ফিরত।

প্রয়াত কমল গুহ (একদা ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা ও মন্ত্রী) বলতেন, তাঁর জেলা কোচবিহারেও একই ছবি। মুর্শিদাবাদের কিছু জায়গা, মালদার বামনগোলা, হবিবপুর সর্বত্র একই চিত্র। এঁদের এক বিরাট অংশ নমঃশূদ্র। তাঁদের অনেকেই আবার মতুয়া। তুলনায় বর্ণ হিন্দু খুবই কম। আশির দশকের মাঝ থেকে এই ২০০৫ এ খালেদা জিয়ার শাসন কাল অব্দি এই চিত্র অব্যাহত ছিল। সব থেকে বেশি ঘটে ছিল নয়ের দশকে।

একই ছবি ছিল আসাম ও ত্রিপুরাতে। আসামে প্রচুর জমি। দাম কম। আর অহমিয়ারা বিশেষ চাষ আবাদ করতে পারে না বা চায় না। তাই এদের বেশিভাগই জল-জঙ্গল পরিষ্কার করে শস্য ফলিয়েছেন। বা ক্ষেতমজুর হয়েছেন অন্যের জমিতে। চাষ আবাদ করে লাভের টাকায় ব্যবসা শুরু করেছেন। বদরুদ্দিন আজমলের পার্টি AUDF অবশ্য নানা কৌশলে অনেকের নামই বিশেষ করে বাংলাদেশি মুসলিমদের নাম NRC তে নথিভুক্ত করাতে পেরেছে।

বাংলাদেশি হিন্দুদের সংখ্যা কত? আমার প্রাথমিক অনুমান পশ্চিমবঙ্গে ২০ লাখ এর কম না। অসমে ১৫ লাখ। তার মধ্যে NRC তে বাদ যাওয়া ১২ লাখ আছেন। ত্রিপুরা তে আরো ৫ লাখ হবেন। সব মিলিয়ে ৪০ লাখের কম হবে না।

এই উদ্বাস্তু বা অনুপ্রবেশকারীরা একটা লিবারেশন ফোর্সও তৈরি করেছিল। অনেকটা শ্রীলঙ্কার তামিলদের মত। যদিও অস্ত্র বলতে দা, কাটারী বা বোমা। এঁদের দাবি ছিল, বাংলাদেশেই একটা জেলার মত স্বাধীন রাষ্ট্র। সেই সংগঠনের অনেক লিফলেট ও দলিল এক সময় আমার কাছে ছিল। কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই তা কার্যকর হয়নি।

সময়ের সঙ্গে এঁদের পরিবার বেড়েছে। আর্থিক অবস্থাও আগের মত অতটা খারাপ নেই। এই মানুষগুলোর কারও রেশন কার্ড আছে। কারও ভোটার কার্ড আছে। কারও কিছুই নেই। কিন্তু এদের অধিকাংশকেই চ্যালেঞ্জ করলে নাগরিকত্বের কোনও প্রমান দেখতে পারবে না। 2006 সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এর আমলে সীমান্ত এলাকায় গিয়েও তা দেখেছি।

বার বার নাগরিকত্বের দাবিতে এরা আন্দোলন করেছেন । কেউ এই মানুষদের পাত্তা দেয়নি। সংবাদ মাধ্যম খবর করেনি। সেই সময়ে আমরা কলকাতার ভদ্রলোক বাঙালিরা এদের পাত্তা দিইনি। দেব কেন? এরা কে ? আমরা জ্যোতি বসু জানি। ব্র্যান্ড বুদ্ধ জানি। আমরা মাটির মমতা জানি।

২০১০ সালের ২৮ ডিসেম্বর মতুয়া মহাসঙ্ঘের ডাকে এই মানুষরা নাগরিকত্বের দাবিতে কলকাতায় একটা বিরাট সমাবেশ করে। তত দিনে ২০০৯ এর লোকসভা ভোটে সিপিএম ধাক্কা খেয়েছে। কলকাতার ভদ্রলোক বাঙালি ‘মতুয়া’ কথাটা শিখেছে। তো ওই সমাবেশে উপস্থিত হয়ে বিজেপি তথাগত রায়, তৃণমূলের মুকুল রায়(তখন দলে দ্বিতীয় ব্যক্তি), জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, সিপিএমের গৌতম দেব সবাই এঁদের দাবিকে সমর্থন করেন। সেই দাবি কিন্তু মর্যাদা পেল অমিত শাহ নামে একজন গুজরাটির হাতে। যাঁর হাত খুব পরিষ্কার নয়। একে কী বলবেন !!! ironic?

এখন প্রশ্ন মুসলিমরা কি বিগত ৩০ বছরে বাংলাদেশ থেকে আসেনি ? এসেছে। সব থেকে বেশি এসেছে আসামে। আমার হিসেবে গোটা দেশে বাংলাদেশ থেকে আসা এমন নাগরিকত্ব-বিহীন মুসলিমের সংখ্যা ৫ লাখের কিছু বেশি হবে। যাঁদের নাম আসামের NRC তে নেই। পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে সব থেকে বেশি মুসলিম এসেছে দুই দিনাজপুর জেলায়। গত 20 বছরে ওখানকার জনসংখ্যার ভারসাম্য বা demography change হয়েছে দ্রুত। বাংলাদেশি মুসলিমদের বড় অংশ খুব দ্রুত হিন্দি ভাষা রপ্ত করে নিয়ে গুরগাঁও, দিল্লি, মুম্বাই বা বাঙ্গালুরে বিভিন্ন ধরণের কাজে লিপ্ত হন। যাতে বাংলাদেশি বলে ধরা না যায়। মহিলারা বাড়ির ঝিয়ের কাজ করেন। পুরুষরা রিকশা চালান বা রাজমিস্ত্রি। মুসলিমদের বেশির ভাগ কিন্তু এসেছেন জীবিকার সন্ধানে। ঠিক যেমন যুদ্ধ বিধ্বস্ত আরব দুনিয়া থেকে মুসলিম যুবকরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যায়। বা মেক্সিকো থেকে লাতিন যুবক-যুবতীরা আমেরিকায়। CAB পাশ হওয়ার পর এরা অনেকেই কিন্তু বিপদে পড়বে। অত্যন্ত চিন্তায় আছেন। আর বিজেপিও সেটাই চায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম এ বহু বছর ধরে চাকমা বৌদ্ধদের বাস। ইংরেজ আমলের আগে থেকেই। কিন্তু বাংলাদেশে এদের উপরেও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কারণেই চরম অত্যাচার হয়েছে। বিশেষ করে নয়ের দশকে। যা নিয়ে UNO বার বার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সতর্ক করেছে বাংলাদেশকে। মুসলিমদের হাতে অত্যাচারিত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে এই চাকমারা কেউ মণিপুর কেউ ত্রিপুরায় বা মেঘালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এ নিয়ে মনিপুরী বা পার্বত্য ত্রিপুরার আদিবাসীরা প্রচন্ড খাপ্পা। ক্যাব এদেরও নাগরিকত্ব দেবে। এই বৌদ্ধ চাকমারা তাই আজ খুশি।

(২) অসম জ্বলছে।

কারণ কী? অহমিয়ারা NRC চায়। যাতে বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালিরা (হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের জন্যই) ওখানে নাগরিকত্ব না পায়। ১৯৭১ সালের পরে আসা বাংলাদেশি বাঙালিরা আসামে নাগরিকত্ব পেলে অহমিয়ারা ভাষা, সংস্কৃতি, পেশা এবং জমির মালিকানার ক্ষেত্রে বিরাট ধাক্কা খাবে। নিঃসন্দেহে যুক্তি আছে। আসামে বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম, নক্সাল সবাই কিন্তু NRC র সমর্থক। কেউ বিরোধী নয়। এটা জেনে রাখুন। কলকাতায় এরা নানা রকম কথা বলছে।

১৯৫১ সালে আসামে NRC হওয়ার কথা ছিল। হয়নি। ১৯৮৫ সালে রাজীব গাঁধীর সঙ্গে ASSU র চুক্তির পরে হওয়ার কথা ছিল। হয়নি। তখনই cut of year ধরা হয় ১৯৭১। ৩৪ বছর পর 2019 এ NRC হলো। তাও কংগ্রেস আমলে অর্থাৎ তরুণ গগৈ মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়েই সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা হয়েছিল। ২০১৬ তে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় NRC করতে হবে। বিজেপির কেউ কিন্তু মামলা করেনি। ASSUর হিসেব মত ৪০ লাখ না হলেও NRC তালিকায় ১৯ লাখ লোকের নাম নেই। ভুলে ভরা NRC হলেও তার মধ্যে থাকা ১২ লাখ হিন্দু বাঙালির নাম ক্যাব এর দৌলতে বাদ চলে যাবে। অর্থাৎ তারাও নাগরিকত্ব পাবে। তার বিরোধিতাতেই উজনী আর লোয়ার আসাম (ডিব্রুগর, জোরহাট, গুয়াহাটি) জ্বলছে। কিন্তু বারাক উপত্যকা অর্থাৎ শিলচর- কাছাড় এর বাঙালিরা খুশি। সেখানে উৎসবের মেজাজ। ওই এলাকায় কিন্তু চারটে লোকসভা কেন্দ্র।

৩) ত্রিপুরার বিক্ষোভ

ত্রিপুরার আদিবাসীরা চায় না, বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালি হিন্দুরা ওই রাজ্যে নাগরিক হোক। যেমন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের বাবা হয়েছেন। তাই বিক্ষোভ। আদিবাসী মেয়েরাও রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু বাঙালিরা খুশি। তারাই ত্রিপুরায় সংখ্যাগুরু।

৪) মণিপুর হিন্দু আরও স্পষ্ট করে বললে বৈষ্ণব প্রধান রাজ্য। সেই রাজ্যের মানুষ চায় না চাকমা বৌদ্ধরা নাগরিকত্ব পাক। তাই মণিপুর জ্বলছে।

অর্থাৎ NRC আর CAB এক নয়। আন্দোলনের কারণও রাজ্যে রাজ্যে আলাদা।

এখন পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম সবাই চাইছে বাংলাদেশ থেকে আসা ৫-৭ লাখ মুসলিম বাঙালিকেও ক্যাবের আওতায় আনা হোক। তাদের লক্ষ্য মুসলিম ভোট। বিজেপি সঙ্গত কারণেই তা চায় না। তাদের লক্ষ্য হিন্দু ভোট।

আপনি কোন পক্ষ নেবেন সেটা আপনার ব্যাপার। আমি শুধু সত্যিটা বললাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *